অর্থ বিল ২০২৬ পাস

করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হলো, কমল লভ্যাংশের ওপর কর

বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী ও শুল্ক-কর ছাড়ের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে গতকাল ‘অর্থ বিল ২০২৬’ পাস হয়েছে।

অর্থ বিলের সংশোধনীতে ব্যক্তি শ্রেণীর করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধির পাশাপাশি জমি-ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাব খোলাসংক্রান্ত টিআইএন এবং বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশের বিধান প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। গতকাল জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। গতকাল বিলটি পাসের সময় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী জাতীয় বাজেটে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনেন।

মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবী করদাতাদের স্বস্তি দিয়ে আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য ব্যক্তি শ্রেণীর করমুক্ত আয়ের সীমা ক্রমান্বয়ে বাড়ানোর প্রস্তাব পাস হয়েছে। সংশোধিত কাঠামো অনুযায়ী ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ টাকা, যা এর আগে প্রস্তাবিত বাজেটে ছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ফলে আগামী অর্থবছর থেকে ব্যক্তি শ্রেণীর সাধারণ করদাতারা তাদের আয়ের ওপর সাড়ে ৩ লাখ টাকার পরিবর্তে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা ভোগ করবেন। এ ধারাবাহিকতায় ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা বেড়ে সাড়ে ৪ লাখ টাকা হবে, যা প্রস্তাবিত বাজেটে ছিল ৪ লাখ টাকা। এছাড়া ২০৩০-৩১ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা উন্নীত হবে ৫ লাখ টাকায়, যা প্রস্তাবিত বাজেটে ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর জনসাধারণের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে ‘বিভ্রান্তি’ ও ‘উদ্বেগ’ সৃষ্টি হয়। অর্থ বিলে এমন তিনটি বড় প্রস্তাব সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার করায় আগের মতোই টিআইএন ছাড়া সাধারণ মানুষ ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবেন। সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় জমি-ফ্ল্যাটের বণ্টন দলিল এবং নামজারি নিবন্ধনের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবটিও বাতিল করা হয়েছে। তাছাড়া প্রকৃত বাজারমূল্য ও মৌজা মূল্যের পার্থক্য নিরসনে বাজেটে যে বিশেষ বিধান রাখা হয়েছিল, তা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে—এমন সমালোচনার মুখে অর্থ বিল থেকে প্রত্যাহার করা হয়। অর্থমন্ত্রী জানান, জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়েই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পুঁজিবাজারে প্রাণসঞ্চার ও বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে অর্থ বিলে বেশকিছু কর সুবিধা দেয়া হয়েছে। নতুন নিয়মে জিরো কুপন বন্ডের আয়কে সম্পূর্ণ করমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর রেয়াত পাওয়ার জন্য আগে যে ৫ লাখ টাকার বিনিয়োগ সীমা ছিল, তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে যেকোনো পরিমাণ শেয়ার হস্তান্তরপূর্বক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলেই সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওপর আড়াই শতাংশ হারে কর হ্রাসের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), ডিরেক্ট লিস্টিং, রাইট ইস্যু অথবা রিপিট পাবলিক অফারের মাধ্যমে ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জে কেনাবেচার জন্য অফলোড করা হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি আরো আড়াই শতাংশ হারে কর রেয়াত পাবে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত বা অতালিকাভুক্ত—যেকোনো কোম্পানি যদি তাদের সব আর্থিক লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করে, তবে তারা অতিরিক্ত আরো আড়াই শতাংশ কর হ্রাসের সুবিধা পাবে। ফলে যেসব তালিকাভুক্ত কোম্পানি পুঁজিবাজারে ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার অফলোড এবং ক্যাশলেস লেনদেন নিশ্চিত করবে, তাদের মোট করহার অতালিকাভুক্ত কোম্পানির তুলনায় সাড়ে ৭ শতাংশ কম হবে। পাশাপাশি পাস হওয়া অর্থ বিলে কোম্পানি করদাতাদের লভ্যাংশের ওপর প্রদেয় করহার কমিয়ে ২০ শতাংশ এবং ব্যক্তি করদাতাদের লভ্যাংশের ওপর প্রদেয় করহার কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ কর বহাল রাখার কথা বলা হলেও চূড়ান্ত অর্থ বিলে তা অর্ধেক কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে অনলাইন ওটিটি প্লাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিন ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এতে আনুষ্ঠানিক ও বৈধ চ্যানেলের ব্যবহার বাড়বে, হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদান কমবে এবং কর পরিপালন বৃদ্ধি পাবে।

স্থানীয় উৎপাদন ও রফতানিমুখী শিল্পকে চাঙ্গা করতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড় দেয়া হয়েছে। আমদানি করা চিংড়ির খাদ্য, প্রোবায়োটিক, ভিটামিন, খনিজ ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর থেকে শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ওষুধ ও অন্যান্য শিল্পে ব্যবহৃত আমদানি করা মধুর ওপর থেকে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া শিল্পে বহুল ব্যবহৃত পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। নির্মাণ ও ভারী শিল্পের ক্ষেত্রে ফায়ার ডোর তৈরির কোল্ড-রোলড শিট, বৈদ্যুতিক কেবল উৎপাদনে ব্যবহৃত রিফাইন্ড কপার ওয়্যার এবং আমদানি করা ফায়ার ব্রিকের ওপর থেকে ভ্যাট, অগ্রিম কর ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার বা বাতিল করা হয়েছে। দেশীয় কাজুবাদাম প্রক্রিয়াকরণের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় অটোমোবাইল শিল্পকে উৎসাহিত করতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাসের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

গহনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ খাতে নতুন ভ্যাট কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। সোনা, প্লাটিনাম ও হীরার গহনার ওপর সুনির্দিষ্ট ভ্যাট প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং রুপার গহনার ওপর ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব অলংকার কেনার ক্ষেত্রে বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রয়মূল্যের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটার বিধান যুক্ত হয়েছে। এছাড়া বিটিআরসির সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি চুক্তির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি এবং সরবরাহকারী পর্যায়ে সব ধরনের মাছ সরবরাহে পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর পরিপালন সহজ করতে নির্বাচিত কয়েকটি খাতে ভ্যাট ব্যবস্থার কো-ইফিশিয়েন্ট দাখিলের বাধ্যবাধকতাও শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

পাস হওয়া অর্থ বিলে করছাড়ের পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধ, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর পরিপালন সহজ করতে কিছু বিধান বহাল রাখা হয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করলে সেই ঘাটতির ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। তবে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ নিয়মের বাইরে থাকবে। নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মূলধন বা বার্ষিক বিক্রি রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিসংঘের জন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট দ্বারা নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ এবং এমএফএস মার্চেন্ট হিসাবের ক্ষেত্রে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি যৌথ উন্নয়ন চুক্তির আওতায় জমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট বা নগদ অর্থ পেলে সেটিকে মূলধনি প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য করে কর আরোপের বিধানটি বহাল রাখা হয়েছে।

গতকাল জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিগত সরকারের ভুল নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার এবং কৃত্রিমভাবে টাকার মূল্যমান ধরে রাখার কারণে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও অর্থনীতি চরমভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এ বাজেট কেবল সরকারের বার্ষিক আর্থিক বিবৃতিই নয়, বরং এটি জনজীবনে স্বস্তি আনা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের রূপরেখা।’ অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবেলাকে সরকার সর্বোচ্চ সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতার মধ্যেও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির কার্যকর সমন্বয় করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এরই মধ্যে ৬০টি পণ্যের উৎসে কর হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রবৃদ্ধি অর্জনের চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষি, শিল্প, আইসিটি ও ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দেয়া হচ্ছে।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকার করের হার না বাড়িয়ে কর ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং কর ব্যবস্থার অটোমেশনের নীতি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক স্থবিরতা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের চার মাসের পদক্ষেপে এনবিআর প্রথমবারের মতো ৪ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের মাইলস্টোন অতিক্রম করেছে। বাজেটে শৃঙ্খলা ফেরাতে ক্রমান্বয়ে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে উন্নয়ন ব্যয় আগের ২৭ দশমিক ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং পরিচালন ব্যয় ৭২ দশমিক ৭৩ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সরকারের নির্ভরতা কমাতে এবং বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ৬ হাজার কোটি টাকা হ্রাসের প্রস্তাব করা হয়েছে।’

অর্থ বিল পাসের আগে গতকাল জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন থাকার বাধ্যবাধকতা তুলে নেয়ার প্রস্তাব করেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া আরো কয়েকটি ক্ষেত্রে শুল্ক-কর কমাতে অর্থমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা আরো বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ কর বছরের জন্য ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হলেও প্রধানমন্ত্রী তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার অনুরোধ জানান। একইভাবে ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ কর বছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ কর বছরের জন্য তা ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তবে শর্ত দিতে হবে যে কর সুবিধার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব করতে হবে এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ বাড়াতে হবে।’

চিংড়ি শিল্পের প্রসার ও রফতানি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী ফিড অ্যাডিটিভ, প্রোবায়োটিকস, ভিটামিন, মিনারেলস ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন। এছাড়া স্থানীয় শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর সুপারিশ করেন।

তিনি বলেন, ওষুধ ও শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত মধু আমদানির ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত। পাশাপাশি পিইটি রেজিন, পিভিসি, কোল্ড-রোলড শিট, রোল প্রডাক্টের অক্সাইডসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক কমাতে বা প্রত্যাহার করতে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়ী বর্তমানে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, ওটিটি প্লাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং অন্যান্য অনলাইন মিডিয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার করেন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট থাকায় অনেক সময় ব্যবসায়ীরা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে বিজ্ঞাপনের অর্থ পরিশোধ না করে অন্যভাবে অনানুষ্ঠানিক উপায়ে অর্থ পরিশোধ করেন। ফলে ওই ব্যক্তির যেমন লাভ হচ্ছে না, একই দিকে সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে। আমি মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানাতে চাই যে এটার ওপর যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আছে, সেটি কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হোক। এতে আমরা বিশ্বাস করি যে যারা অন্যভাবে পেমেন্টটা করছেন তারা উৎসাহিত হবেন প্রপার ওয়েতে পেমেন্ট করার জন্য।’

প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘জীবনবান্ধব বাজেট’ আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ বিবেক-বুদ্ধি-জ্ঞান দিয়ে এমন বাজেট দেয়ার চেষ্টা করেছি, যেটা সব শ্রেণী-পেশার মানুষের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জ্বালানি খাতে অগ্রাধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করার কথা তুলে ধরেন।

নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬১ পণ্যের ওপর কর প্রত্যাহার করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এবারের বাজেট উপস্থাপনের আগে-পরে কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি। জনগণের প্রতি যে দায়িত্ব, তার কিছুটা হলেও সরকার পূরণ করতে পেরেছে, তাদের স্বস্তি দিতে পেরেছে।’

বক্তব্যে কৃষকদের ঋণ মওকুফের পাশাপাশি কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, প্রবাসী কার্ডসহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

সরকারের বাজেটের প্রধান তিনটি লক্ষ্য এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা পুনরুদ্ধারে তিন ধাপে অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘এ বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনীতিকে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর কবল থেকে বের করে নিয়ে এসে সাধারণ নাগরিকের এতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং এর মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক মর্যাদাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।’

সরকারপ্রধান জানান, এবারের বাজেটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়ে সরকার জোর দিতে চাইছে। সেগুলো হলো দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা; অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের চাকা বেগবান করা।

প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা ব্যারাজ বাস্তবায়ন নিয়েও কথা বলেন। তিনি তিস্তা ব্যারাজ মাস্টারপ্ল্যানকে জাতীয় অগ্রাধিকার উল্লেখ করে বলেন, ‘দেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষিকে সহায়তা দেয়া এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে যেকোনো মূল্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।’

আরও